বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তরের জন্য সমন্বিত নীতি, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ লক্ষ্যে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় তারা বলেন, শুধু জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বের হওয়ার পরিকল্পনা নয়, বরং সামাজিক ন্যায্যতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই জ্বালানি রূপান্তর বাস্তবায়ন করতে হবে।
আজ শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি রূপান্তর: প্রেক্ষিত ন্যায্যতা ও অর্থায়ন শীর্ষক ওই পরামর্শ সভাটি যোথভাবে আয়োজন করে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এবং ফসিল ফুয়েল ট্রিটি ইনিশিয়েটিভ।
ধরা’র সহ-আহ্বায়ক এম এস সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে সভার প্রেক্ষাপট ও সূচনা বক্তব্য দেন সদস্য সচিব শরীফ জামিল এবং ‘জ্বালানি রূপান্তরের বিষয়সমূহ’ নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়াটারকিপার্সের গবেষণা প্রধান মো. ইকবাল ফারুক।
প্রেক্ষাপট ও সূচনা বক্তব্যে শরীফ জামিল বলেন, শুধুমাত্র ফসিল ফুয়েল থেকে বের হওয়ার রোডম্যাপ তৈরি করলেই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে জলবায়ু অর্থায়ন ও ন্যায্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমান কার্বন মার্কেট ও কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাগুলো উন্নত দেশসমূহকে দূষণ চালিয়ে যাওয়ার পরোক্ষ বৈধতা দেয়। তাই জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার রোডম্যাপ তৈরির পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উন্নয়ন মডেলের কারণে দেশের কৃষক, জেলে, নারীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাই দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে জ্বালানি রূপান্তর শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি দেশের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু নীতিনির্ধারণে সেই দূরদর্শিতার ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা এবং শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব রূপান্তরের পথে বড় বাধা। সোলার খাতে কম শুল্ক ঘোষণার পরও অতিমূল্যায়নের কারণে বাস্তবে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তিনি শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা, ন্যায্য নীতি এবং সহজ অর্থায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানা বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশ ক্রমেই এলএনজি নির্ভর হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। এলএনজি আমদানিতে বিপুল ব্যয় ও ভর্তুকির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করলে তা আরও সাশ্রয়ী ও টেকসই হতো। বিদেশি প্রভাবের কারণে দেশের জ্বালানি পরিকল্পনায় জাতীয় সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সোলার রুফটপে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ সংকট দূর করার আহ্বান জানিয়ে এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ বন্ধের দাবি তোলেন মোশাহিদা।
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি)-এর প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ কেবল জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা নয়; এটি অভিযোজন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ন্যায্যতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক আলোচনা এখনও কার্যকরভাবে জাতীয় নীতিতে প্রতিফলিত হয়নি। এনডিসি, ন্যাপ ও এলটি-লেডস-এ সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন এবং বিকল্প ন্যারেটিভ তৈরি ছাড়া এই রূপান্তর সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ বিদ্যমান আইনি বাধাগুলো এখনও দূর করা হয়নি। ভূমি ব্যবহার ও মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা, বিশেষ করে সেচ পাম্পের ক্ষেত্রে, বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। তিনি একটি সমন্বিত ‘মাদার ল’ প্রণয়নের আহ্বান জানান, যা বিদ্যমান সাংঘর্ষিক আইনগুলোকে সমন্বিত করবে।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার (জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন) আবুল কালাম আজাদ বলেন, জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক সমর্থন ইতোমধ্যেই রয়েছে, কিন্তু ফসিল ফুয়েল লবির প্রভাব বড় বাধা হয়ে আছে। সমন্বিত উদ্যোগ, নীতিগত সংস্কার এবং সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই বাধা দূর করতে হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে একটি ন্যায়ভিত্তিক রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, বর্তমানে দেশের প্রাথমিক জ্বালানির ৬২ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর, যার ফলে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এলএনজি ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর জ্বালানির উচ্চ ব্যয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন, সিস্টেম লস কমানো এবং কার্যকর সাবসিডি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন রিভার বাংলা’র সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ, ব্রাইটার্সের ফারিহা অমি, ইউথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের সোহানুর রহমান, ইউক্যানের যুধিষ্ঠির চন্দ্র বিশ্বাস প্রমুখ।
















