আলমগীর হোসেন: বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে—বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও ঘনত্ব বেড়ে চলেছে। এই সংকট মোকাবেলায় উন্নত দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অর্থায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে উন্নয়নশীল ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে। অথচ সমস্যার মূল কারণ হিসেবে যেসব শিল্পোন্নত দেশ অতীতে ও বর্তমানে বেশি কার্বন নিঃসরণ করছে, তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে গাফিলতি রয়েছে।
২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির আওতায় বিশ্বের দেশগুলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার অঙ্গীকার করে। পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল—উন্নত দেশগুলো প্রতি বছর উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ১০০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেবে। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দেখা গেছে, এই অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নিয়মিতভাবে পূরণ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে হিসাব-নিকাশের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে প্রকৃত নতুন অর্থের পরিবর্তে পুরনো সহায়তা বা ঋণকে জলবায়ু অর্থ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘাটতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলো, যেমন United States, China, India এবং European Union—জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন সময়ে জলবায়ু তহবিল ও কার্বন হ্রাস উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা বললেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং নীতি পরিবর্তনের কারণে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে চীন ও ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলোও ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা ও উন্নয়ন লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে কার্বন নিঃসরণ কমানোর গতি প্রত্যাশার চেয়ে ধীর রাখছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো অভিযোগ করছে যে, প্রতিশ্রুত অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা না পাওয়ায় তারা অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠছে। অনেক দেশের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলার দায়িত্ব শুধু তাদের একার নয়; যেসব দেশ ঐতিহাসিকভাবে বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে, তাদেরই বেশি দায়িত্ব নেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে সেই দায়িত্ব বণ্টন এখনো সমানভাবে কার্যকর হয়নি।
জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে ঋণ হিসেবে দেওয়া অর্থকেও জলবায়ু সহায়তা হিসেবে গণনা করা হচ্ছে, যা প্রকৃত সহায়তার পরিমাণ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। ফলে প্রয়োজনীয় অর্থ ও সহায়তা সময়মতো না পৌঁছানোয় অনেক প্রকল্পই কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না।
প্রতি বছর অনুষ্ঠিত কপ (COP) সম্মেলনগুলোতে প্রতিশ্রুতি ও আলোচনার পুনরাবৃত্তি হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিটি সম্মেলনে নতুন লক্ষ্য ঘোষণা করা হলেও আগের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা জলবায়ু সহযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে বৈশ্বিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো ইতোমধ্যেই লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, বন্যা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এসব সমস্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রযুক্তি সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। তবে প্রতিশ্রুত জলবায়ু অর্থায়ন পুরোপুরি না পাওয়ায় জাতীয় পর্যায়ের অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ধীরগতিতে এগোচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন এবং জনজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোর উচিত নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তাদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরাসরি অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা বাড়ানো জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সংকট, যা কোনো একক দেশ বা অঞ্চলের পক্ষে একা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাই উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আস্থা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। অন্যথায় বৈশ্বিক সহযোগিতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেইসব দেশ, যারা এই সংকটের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী।















