জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে, বাস্তবসম্মত নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ প্রণয়ন করাসহ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনা দাবি করেছে। সেইসাথে, প্রতিটি খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে, বাস্তবসম্মত নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।
গতকাল রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি সংগঠনের প্রতিনিধিদের আয়োজন এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করা হয়। প্রতিনিধিরা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনাটি (২০২৬–২০৫০) গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও ‘স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই’ তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশ ও সমাজের প্রভাব পর্যাপ্তভাবে বিবেচনা করা হয়নি এবং জনগণের অংশগ্রহণকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি তাদের।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন)-র নেটওয়ার্ক এডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা।
মূল বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘যেভাবে অতীতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি আইন ব্যবহার করে বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, ইপিএসএমপি ২০২৫ সেই একই পথে ভবিষ্যতেও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার কাঠামো তৈরি করছে।’ তিনি আরো বলেন, মহাপরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’-কে ব্যপক প্রচার করা হলেও বাস্তবে প্রকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ সেখানে মাত্র ১৭ শতাংশ, যেখানে কাগজে দেখানো হয়েছে ৪৪ শতাংশ ।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫দশমিক ৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫ দশমিক ২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ২৫ বছর পরও এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরতা ৫০ শতাংশ থাকবে- যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং ও কার্বন ক্যাপচার (সিসিএস)– এর মতো ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিকে সমাধান হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয় এবং ভবিষ্যতে দেশকে নতুন ঋণ, ভর্তুকি ও পরিবেশগত সংকটে ফেলবে।
বিডব্লিউজিইডি এর সদস্য সচিব হাসান মেহেদী জানান, কোনো ধরনের জনশুনানি বা উন্মুক্ত পরামর্শ ছাড়াই এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের অস্বচ্ছ ও দায়মুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নেরই পুনরাবৃত্তি।
লিডের গবেষণা পরিচালক এডভোকেট শিমনউজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনের ঠিক আগ মূহূর্তে, নাগরিক সমাজকে উপেক্ষা করে একই ধরনের (আইইপিএমপি ২০২৩ এর মতো) মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন সত্যিই হতাশাজনক।’
ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ এর পরিচালক (প্রোগ্রাম এভিডেন্স অ্যান্ড লার্নিং) মুনীর উদ্দীন শামীম বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এ ধরনের মহাপরিকল্পনা নাগরিক হিসেবে আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি যদি এভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে রপ্তানি খাত চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ২০২৭ সালের পর আমাদের নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।’
বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)-এর উদ্যোগে এবং উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), আমরাই আগামী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ (সিইপিআর), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (ইটিআই বাংলাদেশ), জেট-নেট বিডি, লয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (লিড), মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ), রি-গ্লোবাল, সৌহার্দ ইয়ুথ ফাউন্ডেশন, সেইফটি অ্যান্ড রাইটস (এসআরএস), ওয়াটারকিপার্স ও শ্রমিক-নেতৃত্বাধীন ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ওয়ার্কার ক্যান)-এর সহ-আয়োজনে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন জেটনেট-বিডি এর ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর সমন্বয়ক (সিডিইউ) ওয়াসিউর রহমান তন্ময় এবং ওয়াটারকিপার্স এর ম্যানেজার সৈয়দ তাপসসহ অনেকে।
সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি বিষয় নিয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অনেকগুলো বিসয়ে একমত হয়েছেন। সেগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা ‘অতিমাত্রায়’ দেখানো হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন সক্ষমতা, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপাবে।

















