Monday , 16 March 2026 | [bangla_date]
  1. কৃষি পরামর্শ
  2. কৃষি সংবাদ
  3. জলবায়ু ও পরিবেশ
  4. নগরায়ন
  5. পর্যটন
  6. পশুপালন ও মৎস্য
  7. বিশেষ প্রতিবেদন

নতুন সরকার: কৃষি ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কোথায়

প্রতিবেদক
krishokbarta
March 16, 2026 7:35 am

[

IMG 20260220 WA0009শাফিউল আল ইমরান: দেশের বর্তমান আবহাওয়া পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিখাতে ব্যাপক সংস্কার ও গবেষণার প্রয়োজন। নির্বাচনে বিপুল ভোট পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, নতুন সরকারের সামনে রয়েছে নানা প্রত্যাশা, আছে চ্যালেঞ্জ। দলটির নির্বাচনি ইশতাহারে কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় মাঠ পর্যায়ে এই খাত ঘিরে বড়ো প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কারণ কৃষিখাতকে মনে করা হয় বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার মেরুদণ্ড।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জমি কমছে, উৎপাদন খরচ ও আমদানি-নির্ভরতা বাড়ছে, ন্যায্যমূল্য অনিশ্চিত। বিএনপির ইশতাহারের অঙ্গীকারÑ কৃষক কার্ড, সরাসরি ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বিমা, বাজার সংস্কার যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে কৃষিতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বাজেট বরাদ্দ, জবাবদিহি ও নীতির ধারাবাহিকতা।

বিএনপির ইশতাহার জনমানুষের মধ্যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এগুলো স্বল্প সময়ে পূরণ সম্ভব নয়। নতুন ক্ষমতাসীন দল ইশতাহারে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বললেও নির্বাচনি ইশতাহার পূরণ করতে যে অর্থের প্রয়োজন হবে, তা জোগাড় করা বেশ কঠিন হবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন। মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা, উৎপাদন কাঠামো, বাজার, আমদানি-নির্ভরতা পর্যালোচনা করে একটি পথ নকশা দরকার।’

‘সরকারকে ডাল, তেলবীজ, মশলা, সবজি মিলিয়ে অন্তত ২০ ধরনের পণ্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনতে হবে। কমপক্ষে ২৫ শতাংশ লাভ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন একটি মূল্য কমিশন’, বলে মত তার।

গবেষণা ও সম্প্রসারণে দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো কাজ করছে। কিন্তু সেই উদ্ভাবন মাঠে দ্রুত পৌঁছায় না। ইউনিয়ন পর্যায়ে দক্ষ কৃষিবিদ নিয়োগের উদ্যোগ যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে কৃষক সরাসরি প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবেন। গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের প্রয়োগের মধ্যে সমন্বয়ই কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। এসিআই অ্যাগ্রিবিজনেসের প্রেসিডেন্ট ড. এফ. এইচ. আনসারী বলেন, ‘আমাদের দেশের কৃষিতে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের বীজ এবং প্রাণিসম্পদ গবেষণায় আরও বিনিয়োগ করতে হবে। এই গবেষণার ভালো অঙ্কের টাকা ছাড় করতে হবে। সেই ছাড়ের টাকাটা যেমন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় পাবে তেমনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্যাপাসিটি বিল্ড করার জন্য এ সাপোর্টটা দিতে হবে।’

আধুনিক কৃষির জন্য প্রয়োজন কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ। যান্ত্রিকীকরণের কারণে যেমন ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে তেমনি সেই ফসল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই। কারণ দেশে উৎপাদিত ফল ও সবজির একটি বড়ো অংশ নষ্ট হয়ে যায়। সরকার প্রতিটি জেলায় আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র গড়ে ওঠে, তবে, কৃষকের আয় অনেক বেড়ে যেতে পারে। এরফলে, ভোক্তাও সাশ্রয়ী মূল্যে সারা বছর পণ্য পাবেন।

ড. এফ. এইচ. আনসারী আরও বলেন, ‘খামার যান্ত্রিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কৃষিতে ফিরিয়ে আনতে হলে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং তাতে সরকারি ভর্তুকি বাড়াতে হবে। তাছাড়া, ফসল তোলার পর যে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায় সেটি রোধ করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কোল্ড স্টোরেজ এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত গুদাম ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।’

সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের পণ্য সরাসরি বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। বিক্রীত পণ্য যাতে গুড অ্যাগ্রিকালচার প্র্যাকটিস(জিএপি) মান বজায় থাকে সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। জিএপি মান নিয়ন্ত্রিত পণ্য রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরগুলোতে কৃষিপণ্যে বিক্রির আউটলেট করতে হবে যাতে কৃষকদের পণ্য সরাসরি ভোক্তার হাতে যায়। এতে একদিকে যেমন হাইজিন বজায় থাকলো তেমনি মান সম্মত কৃষি পণ্য ভোক্তার হাতে এসে পৌঁছালো। ড. আনসারীর মতে, আমাদের স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে যাতে তারা হাইজিন বজায় রাখে। এতে ভোক্তাদের আস্থা বাড়বে এবং কৃষকরা তাদের পণ্যের সঠিক দাম পাবেন। রিটেইল চেইন আছে, আমাদের দেশেও এগুলোর সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং সরকারকে ট্যাক্স ও প্রমোশনাল সাপোর্ট দিতে হবে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস সালাম বলেন, ‘উৎপাদন খরচ বাড়ানো, ন্যায্যমূল্যের অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু ঝুঁকি বর্তমানে কৃষকের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই সরকারের ওপর কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সহজ অর্থায়ন, শস্য ও প্রাণিসম্পদ বিমা, জলবায়ু সহনশীল জাত এবং পানি সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থা কৃষির স্থিতিস্থাপকতা জোরদার করবে।’

কয়েকদিন আগে, ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২৫ বছর মেয়াদি ‘ট্রান্সফর্মিং বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচার : আউটলুক ২০৫০’ শীর্ষক কৃষি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই মহাপরিকল্পনা সম্পর্কে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সমন্বিত নীতি, সরাসরি ভর্তুকি, শক্তিশালী বাজার কাঠামো ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুললে কৃষির রূপান্তর খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে।

কৃষির এই মহাপরিকল্পনা দেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চলে পরামর্শের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়েছে। কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, এ উদ্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার জন্য নয়; ২০৫০ সাল পর্যন্ত কৃষির দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর নিশ্চিত করবে, যা খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান নয়; ২০৫০ সাল পর্যন্ত কৃষিখাতের একটি সুস্পষ্ট ভিশন বাস্তবায়ন করা। তার মতে, আগামী ২৫ বছরে কৃষির রূপান্তর দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

সার্বিকভাবে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের অভিমত, কৃষিখাতের বিদ্যমান সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতা দ্রুত সমাধান না করলে খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জাতীয় স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এসব বিষয়ে টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে আগামী দশকগুলোতে দেশের কৃষি কতটা সক্ষম, প্রতিযোগিতামূলক ও নিরাপদ ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।

সর্বশেষ - কৃষি সংবাদ