Monday , 16 March 2026 | [bangla_date]
  1. কৃষি পরামর্শ
  2. কৃষি সংবাদ
  3. জলবায়ু ও পরিবেশ
  4. নগরায়ন
  5. পর্যটন
  6. পশুপালন ও মৎস্য
  7. বিশেষ প্রতিবেদন

ধানের ফলনে পিছিয়ে বাংলাদেশ – Agri Sangbad

প্রতিবেদক
krishokbarta
March 16, 2026 7:36 am

[

IMG 20260123 WA0000উত্তরের জেলা দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার আনোয়ার হোসেনের পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে ধান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। গত দুই বছর যাবত ৩৫ বছর বয়সী আনোয়ার ধানের পরিবর্তে ভুট্টা চাষে মনোযোগী হয়েছেন। তার ভাষ্য; ধান চাষে নানামুখী সংকটের কারণে সংসারে অভাব অনাটন লেগেই থাকতো।

তবে, গত দুই বছর ধরে তার পরিবারের আগের চেয়ে স্বচ্ছলতা এসেছে। আনোয়ার বলেন, ‘আমার ধান ক্ষেতের চেয়ে ভুট্টাতে পানির সরবরাহ আগের চেয়ে অনেক কম লাগে। শ্রমিক সংকট হয়না। দামোও ভাল।’
তার সাথে কথা বলে জানাগেল; ধান চাষে খরচ বেশি আর ফলনও কম তাই তিনি ধান চাষ রেখে অনান্য ফসল চাষে মনোযোগী হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ এখন হামরা(আমরা) আর ধান বেশি করিনা(আবাদ)। ধানোত খুব লাভ হয়না। ভুট্টার আবাদ করে লাভ হয়, নগদ ট্যাকা(টাকা) পাওয়া যায়।’
আর ধান কাটার সময় কিষাণ পাওয়া যায়না জমিত পড়ে যায়। সিজনের সময় কিষাণ পাওয়া যায়না, আকাশ ভালো না থকলে(জলবায়ু পরিবর্তন) ফলন কমে যায় একারণে ধান আবাদ ,করিনা।
চলতি বছর আনোয়ার হোসেন নিজের দুই বিঘা জমি ছাড়াও আরো তিনি বিঘা জমি লিজ নিয়ে ভ্ট্টুার আবাদ করেছেন।
ওই গ্রামের শরিফুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এই এলাকার মাঠ জুড়ে শুধু ভুট্টা আর ভুট্টা। পুরো মাঠে দুই একটা ধানের জমি। মানুষ আর ধান আবাদ করতে চায়না। আর কৃষি বিভাগ থেকে কেউ আসেওনা।’
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘ ধানোত(ধানে) খরচ বেশি ফলন কম, এক বিঘা মাটিত ভুট্টা না হলোও ৪০ মন হবি। আর ধান হবি খুব জোরে ১৮-২০ মন। আর ভালো জাতের হাইব্রিট ধানের বীজ পাওয়াও মুশকিল। বীজ খারাপ হলে একবারে শেষ হয়ে যাবে।’
শুধু আনোয়ার বা শরিফুল নয়, আলোকিত স্বদেশের পক্ষ থেকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা বলে জানাগেছে, ধানের ফলন কম হওয়ায় তারা ভুট্টা চাষে আগ্রহী হচ্ছে। ধানে সেচ ও জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লোকসান হচ্ছে, যেখানে ভুট্টা কম শ্রমে অধিক লাভজনক ও গোখাদ্য হিসেবেও চাহিদা থাকায় বিকল্প ফসলের দিকে তারা আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৪ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার টন ধান উৎপাদন করে বিশ্বে ভারত-চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান হলেও হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদনে বিশ্বে অনেকটাই পিছিয়ে বাংলাদেশ। মরক্কো, ব্রাজিল, মিসর ও চীনে বাংলাদেশের চেয়ে হেক্টরপ্রতি দেড় গুণ ফলন হয়। অস্ট্রেলিয়ায় ফলন আড়াই গুণ ও তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দ্বিগুণ। এমনকি ভিয়েতনামে বাংলাদেশের চেয়ে হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় দেড় টন বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধানের উচ্চ ফলনশীল জাতের সংখ্যা না বাড়ার পাশাপাশি আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমে আসা এবং ভিন্ন কাজে কৃষিজমির ব্যবহার বাড়ার কারণে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কমে আসছে। এর পাশাপাশি জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে এবং চাষের জন্য পানির যোগানও কমছে। সেইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতি কৃষিকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
কৃষিবিদরা বলছেন, বীজ, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও জলবায়ুর কারণে উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি কৃষকদের জ্ঞানের ঘাটতি, আর্থিক সক্ষমতা, সচেতনতার মতো নানা কারণেও ফলন কম হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ধানে ৮-১৫ শতাংশ পর্যন্ত পোস্ট-হারভেস্ট লস ঘটে, যা কাটাই, মাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণের বিভিন্ন ধাপে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে কাটার কারণে ধান ঝরে পড়ে বা অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে দানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উচ্চ ফলনশীল দেশগুলোতে যেখানে এই ক্ষতি ৩-৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত, সেখানে বাংলাদেশে এই ক্ষতি জাতীয় উৎপাদনের একটি বড় অংশকে অদৃশ্যভাবে কমিয়ে দেয়। পোস্ট-হারভেস্ট ক্ষতিও ধানের কার্যকর ফলন কমিয়ে দেয়।
মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্যমতে, হেক্টরপ্রতি ধানের ফলনে বিশ্বে শীর্ষে অস্ট্রেলিয়া। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটিতে হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ১০ দশমিক ৯২ টন। যুক্তরাষ্ট্রে হেক্টরপ্রতি ফলন ৮ দশমিক ৪১ টন। তুরস্কে ৮ দশমিক ৯৩ টন, মিসরে ৮ দশমিক ৪৪, পেরুতে ৮ দশমিক ২১, মরক্কোয় ৭ দশমিক ৮৬, ব্রাজিল ৭ দশমিক ২৩ ও চীনে এ হার ৭ দশমিক ১৫ টন। জাপানে ৬ দশমিক ৮৭ টন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৬ দশমিক ৮৫, ভিয়েতনামে ৬ দশমিক ১৬ ও ইরানে ৫ দশমিক ৩২ টন। সেখানে বাংলাদেশের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ৪ দশমিক ৮২ টন। ওই অর্থবছরে বিশ্বে হেক্টরপ্রতি ধানের গড় ফলন ছিল ৪ দশমিক ৬৯ টন।
তবে, দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। ভারতে হেক্টরপ্রতি ধানের ফলন ৪ দশমিক ৩৮ ও পাকিস্তানে ৩ দশমিক ৭৪ টন।
বিশ্বে এখন আধুনিক তথা স্মার্ট কৃষির চর্চা চলছে তাতে পিছিয়ে বাংলাদেশ। কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ড্রোনের মাধ্যমে জমির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, রোগ-পোকার আক্রমণ শনাক্ত, বালাইনাশক স্প্রে, খরা বা জলাবদ্ধতা শনাক্তের জন্য স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা, খরা, লবণাক্ততা ও রোগ সহনশীল জাত উদ্ভাবন, কম সময়ে বেশি ফলনের জন্য উন্নত বীজ ও বায়োটেকনোলজি ব্যবহৃত হচ্ছে।
দেশে হাইব্রিড ধানের আবাদ প্রচলন হয় ১৯৯৮ সালে। এরপর গত দুই দশকে চাল উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে হাইব্রিডেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বেশি। সরকারি-বেসরকারিভাবে এ ধরনের ধানের জাত উদ্ভাবন হয়েছে ২১৮টি। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) তথ্য মতে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত লবণাক্ততা-সহিষ্ণু, জলমগ্নতা ও জলবন্ধতা-সহিষ্ণু এবং জোয়ারভাটা-সহিষ্ণু, প্রিমিয়ার কোয়ালিটি, জিংক-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধু ১০০, ব্রি-১০২ সহ ৬১টি ধানের জাত উদ্ভাবন হয়েছে।
এছাড়া আবহাওয়া, বাজারদর, চাষ নির্দেশিকার জন্য বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ বা বার্তা অ্যাপস ব্যবহার বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। তবে এসব জায়গায় বাংলাদেশ এখনো অনেকটাই পিছিয়ে। কৃষি বিভাগ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও তা কৃষকের কোন কাজে লাগছেনা।IMG 20260123 WA0001
এসিআই এগ্রিবিজনেসের প্রেসিডেন্ট ড. এফ. এইচ. আনসারী বলেন, ‘বাংলাদেশ ধানের ফলনে পিছিয়ে আছে অক্ষমতার কারণে নয়, বরং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে। বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, সময়োপযোগী নীতি সহায়তা এবং কৃষককেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ধানের ফলনে অবশ্যই নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যদি আমরা জেনেটিক্স ও বীজ ব্যবস্থা শক্তিশালী করি, সময়সংবেদনশীল ধাপে সেবাভিত্তিক যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ করি, পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা উন্নত করি এবং মাঠপর্যায়ে প্রিসিশন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারি তাহলে স্বল্পমেয়াদেই দেশের গড় ধান ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের পক্ষে ধানের গড় ফলন ৭ টন প্রতি হেক্টরের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া একটি বাস্তব ও বৈজ্ঞানিকভাবে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য ।‘
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধানের উচ্চ ফলনশীল জাতের সংখ্যা না বাড়ার পাশাপাশি আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমে আসা এবং ভিন্ন কাজে কৃষিজমির ব্যবহার বাড়ার কারণে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কমে আসছে। এর পাশাপাশি জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে এবং চাষের জন্য পানির যোগানও কমছে। সেইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতি কৃষিকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এ নিয়ে নানা পদক্ষেপ নেয়ার পরেও হাইব্রিড ধানের প্রতি খুব একটা আকৃষ্ট হচ্ছেন না কৃষকরা। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, হাইব্রিড ধান থেকে উৎপাদিত চালের গুণগত মান কম। দামও বেশি পাওয়া যায় না। যদিও এর বীজের দাম তুলনামূলক বেশি। আবার এর বীজ উৎপাদন করতে যাওয়াটাও অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল, যা কৃষকের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

সর্বশেষ - কৃষি পরামর্শ