বৈশ্বিক উষ্ণতা দ্রুত বাড়তে থাকায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় উঠে আসছে বাংলাদেশ। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাড়তে থাকা তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ইতোমধ্যে দেশের কোটি মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চল ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী অবস্থায় চলে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।
মঙ্গলবার এনভাইরোনমেন্টাল রিসার্চ: হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গবেষণায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত জীবাশ্ম পোড়ানোকে দায়ী করা হয়।
বলা হয়, বাংলাদেশের বয়স্ক মানুষরা এখন বছরে ২,৫০০ ঘণ্টারও বেশি সময় এমন তীব্র তাপের মুখোমুখি হন, যখন নিরাপদে বাইরে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এ সময় ছিল প্রায় ২ হাজার ১৮০ ঘণ্টা।
সহজভাবে বললে, বছরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় বয়স্ক মানুষরা ধীরগতিতে হাঁটা বা হালকা গৃহস্থালি কাজের বাইরে অন্য কোনো কাজ করতে পারেন না, কারণ এতে তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে।
গবেষণাটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মুখে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলেছে। গবেষকদের মতে, উচ্চ তাপমাত্রা, তীব্র আর্দ্রতা এবং ঘনবসতিপূর্ণ জনসংখ্যা—এই তিনটির সমন্বয় বাংলাদেশকে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির দিক থেকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে বয়স্ক মানুষ এখন বছরে ২ হাজার থেকে ২হাজার ৮০০ ঘণ্টা তীব্র তাপের কারণে দৈনন্দিন কার্যক্রমে কঠোর সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছেন। ১৯৫০–এর দশকের তুলনায় এটি কয়েক শ ঘণ্টা বেশি। কেবল বাংলাদেশেই অতীতের তুলনায় বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৩৯০ ঘণ্টা তীব্র তাপের কারণে জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এমন পরিস্থিতিতে সিঁড়ি ভাঙা, ঘরের কাজ করা বা বাইরে হাঁটার মতো সাধারণ কাজও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য, যাদের শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক কম সক্ষম।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে তাপঝুঁকি: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা দ্যা ন্যাচার কনজারভ্যান্সি –এর গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় ১৯৫০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৭০ বছরের বেশি সময়ের জলবায়ু তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে মানবদেহ তাপের প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় তা বোঝার জন্য একটি শারীরবৃত্তীয় মডেলও ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন, যেখানে বছরের সবচেয়ে গরম সময়গুলোতে তাপমাত্রা নিরাপদ শারীরিক কর্মকাণ্ডকে কঠোরভাবে সীমিত করে দেয়—এমনকি তরুণদের ক্ষেত্রেও।
বিশ্বব্যাপী তরুণদের ক্ষেত্রে ১৯৫০–এর দশকে বছরে গড়ে ২৫ ঘণ্টা তীব্র তাপজনিত সীমাবদ্ধতা ছিল, যা গত এক দশকে বেড়ে প্রায় ৫০ ঘণ্টা হয়েছে।
তবে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য পরিস্থিতি আরও গুরুতর। গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বয়স্করা বছরে প্রায় ৯০০ ঘণ্টা এমন তাপের মুখোমুখি হন, যখন নিরাপদে শারীরিক কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯৫০–এর দশকে এ সময় ছিল প্রায় ৬০০ ঘণ্টা।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং জলবায়ুবিজ্ঞানী লুক পারসন্স বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন শুধু তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে না—এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিরাপদভাবে পরিচালনার সময়ও কমিয়ে দিচ্ছে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, কিছু জায়গায় ছায়ার মধ্যেও সামান্য শারীরিক কাজ মানুষের শরীরের শীতল থাকার সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
‘বসবাসের অনুপযোগী’ পরিস্থিতি:
গবেষকেরা এমন কিছু অঞ্চলও চিহ্নিত করেছেন, যেখানে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা তারা ‘বসবাসের অনুপযোগী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, ছায়াযুক্ত ও বাতাস চলাচলকারী জায়গায় বিশ্রাম নিলেও সেখানে বিপজ্জনক তাপজনিত চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ এমন এলাকায় বাস করেন, যেখানে বছরের সবচেয়ে গরম সময়ে বয়স্কদের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশেষ করে ইন্দো-গঙ্গা সমভূমি, যার মধ্যে বাংলাদেশের বড় অংশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চল অন্তর্ভুক্ত, সেখানে নিম্নভূমি, উচ্চ আর্দ্রতা এবং ঘন জনসংখ্যার কারণে তীব্র তাপের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে।
জনসংখ্যার কারণে ঝুঁকি বাড়ছে:
গবেষকদের মতে, কিছু ধনী উপসাগরীয় দেশে তীব্র তাপের ঘণ্টা সংখ্যায় বেশি হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় বড় জনসংখ্যা ও সীমিত শীতলীকরণ অবকাঠামো থাকার কারণে মানুষের ওপর প্রভাব বেশি।
‘পিপল-আওয়ার’ বা মোট মানুষের ওপর তাপের প্রভাব হিসাব করলে দেখা যায়, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধনী ও দরিদ্র দেশের পার্থক্য তাপমাত্রায় নয়, বরং খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতায়—যেমন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কুলিং সেন্টার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোর প্রাপ্যতা।
গবেষণাটি এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ২০২৪ সালকে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
সেই বছর বিশ্বজুড়ে ৪৩ শতাংশের বেশি তরুণ এবং প্রায় ৮০ শতাংশ বয়স্ক মানুষ এমন সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন, যখন তাপ ও আর্দ্রতা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম সীমিত করে দিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, তেল, কয়লা ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমানো না গেলে ভবিষ্যতে তাপজনিত জীবনযাত্রার সীমাবদ্ধতা আরও বিস্তৃত হবে—বিশেষ করে যখন বিশ্বে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
লুক পারসন্স বলেন, ‘যদি আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ না করি, তাহলে তীব্র তাপের কারণে মানুষের বসবাস ও জীবনযাত্রার ওপর সীমাবদ্ধতা আরও বাড়বে এবং তা আরও বিস্তৃত হবে।’
গবেষকদের মতে, তাপঝুঁকি কমাতে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে—যেমন জনসাধারণের জন্য কুলিং সেন্টার, তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, কর্মঘণ্টার সময়সূচি পরিবর্তন এবং নগর পরিকল্পনায় উন্নয়ন। তবে তারা সতর্ক করেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বর্তমান গতিতে বাড়তে থাকলে শুধু অভিযোজন ব্যবস্থা যথেষ্ট হবে না।

















