সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের সমস্যা নয়। বিশ্ব অর্থনীতি প্রতি মিনিটে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি) ক্ষতির মুখে পড়ছে। এফআইসিসিআই-ইওয়াই রিস্ক সার্ভে ২০২৬ অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে জলবায়ুজনিত ক্ষতির পরিমাণ ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহ এবং পরিবেশের অবনতিই ক্ষতির প্রধান কারণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইতিমধ্যেই সরবরাহ চেইন, খাদ্য উৎপাদন ও শ্রম উৎপাদনশীলতাকে ব্যাহত করছে। ২০০০ সালের পর থেকে বৈশ্বিকভাবে ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অর্থনীতির ক্ষতি ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি ব্যবসা, অর্থনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে প্রভাবিত করছে। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
তারা পরামর্শ দিয়েছেন, দেশগুলোকে এখনই পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঝুঁকি কমাতে হবে। সমন্বিত বৈশ্বিক পদক্ষেপ ছাড়া, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে না।
গত বছর পরিবেশবিষয়ক সংস্থা জার্মানওয়াচের ‘ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যা, খরা, ঝড় ও তাপপ্রবাহে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন বা তিনশকোটি ডলার মূল্যের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। পাশাপাশি এসব দুর্যোগে প্রতিবছর ৬৩ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়।
প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৯৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ৯ হাজার ৪০০টির বেশি চরম আবহাওয়া-সংক্রান্ত দুর্যোগে প্রায় ৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে; অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ১৯৯৩ সাল থেকে ডোমিনিকা, চীন ও হন্ডুরাস বন্যা, ঝড় ও তাপপ্রবাহে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ৩১তম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত একটি তীব্র তাপপ্রবাহ পাকিস্তানের নবাবশাহ শহরে ৪৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পৌঁছেছিল, যা ভয়াবহ বন্যার আগে ঘটেছিল। চরম তাপপ্রবাহ ভারত ও বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তিন দেশে ৯০ জনের বেশি মানুষ মারা যান।
জার্মানওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কার্যকর অভিযোজন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুর্যোগজনিত মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এটি বৈশ্বিকভাবে একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। কার্যকর ঝুঁকি প্রতিরোধ ও অভিযোজনের ফলে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়জনিত মৃত্যুহার গত ৪০ বছরে ১০০ গুণের বেশি কমেছে। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে যেখানে ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, ২০০৭ সালে সে সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৩৪-তে।
জার্মানওয়াচের আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতির প্রধান লরা শেফার সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু সংকট একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে, যা বহুপাক্ষিক পদক্ষেপের মাধ্যমে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। সংস্থাটির জলবায়ু অর্থায়ন ও বিনিয়োগ বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ডেভিড একস্টাইন বলেন, গত ৩০ বছরে ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি জার্মানির মোট জিডিপির সমান। জলবায়ু কর্মসূচিতে দেরি করলে আরও বড় অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে।














