
নুরুল আফছার : সম্প্রতি বাংলাদেশে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য তীব্র হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সংবিধান সংস্কার করা উচিত কি না, এ বিষয়ে দেশজুড়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচিত সংসদের অধীনে সংবিধান সংস্কারের পক্ষপাতী, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকারসহ একটি কমিশন প্রস্তাবনা প্রস্তুত করতে কাজ করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান:
গত রোববার জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে সংবিধান সংস্কার কমিশনের এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সদস্য মাহফুজ আলম জানান, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারই সংবিধান সংস্কারের কাজ করবে। তার মতে, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর পুরনো রাজনীতি এবং তার কাঠামো বাতিল করে নতুন সংবিধানের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়। এ কারণে সরকার নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা সংস্কার করতে চায়। সংবিধান সংস্কারে জনগণ, রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি ও আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া মানুষদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন কমিশনের প্রধান অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ।
রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত:
বিএনপিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল মনে করে, সংবিধান সংশোধন করা অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নয়, বরং এটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে হওয়া উচিত। বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাস বলেন, সংবিধানকে যে কেউ নিজের মতো করে পরিবর্তন করতে পারেন না, বরং এটি করতে হলে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মতামত নিতে হবে। দেশের মানুষ বিনা ভোটের সরকারকে মানেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সংবিধান মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে, তাই এর মৌলিক নীতিগুলো অক্ষুণ্ন রেখে অপূর্ণতা দূর করতে হবে। তিনি সংবিধান সংশোধনের জন্য নির্বাচিত সরকারের অধীনেই এ কাজ করার পক্ষপাতী।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হকও একই ধরনের মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব বা সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে করা যেতে পারে, তবে চূড়ান্ত সংশোধন হবে নির্বাচিত সংসদে।
জামায়াতে ইসলামীও সংবিধান পুনর্লিখনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে। তারা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে।
সংবিধান দিবসের আলোচনা:
সংবিধান দিবস উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্টের বার অডিটরিয়ামে এক আলোচনা সভায় সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেন, “সংবিধান একটি পবিত্র নথি, এটি বদলাতে হলে জনগণের মতামত জানতে হবে।” একই অনুষ্ঠানে সংবিধান বিশ্লেষক ড. শাহদীন মালিক বলেন, রাষ্ট্রের সমস্যাগুলোর সমাধান সংবিধান পরিবর্তন করে করা উচিত নয়। ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকনও উল্লেখ করেন যে, সংবিধানের প্রশ্নে বর্তমান বিভ্রান্তি জাতিকে সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সংস্কার কমিশনের পরিকল্পনা ও প্রস্তাব:
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানান, সংবিধান পুনর্লিখন বা পুনর্বিন্যাস হবে কি না, তা রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের মতামতের ওপর নির্ভর করবে। কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে লিখিতভাবে মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করবে এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করবে।
ড. রীয়াজের নেতৃত্বাধীন কমিশন সাংবিধানিক সংস্কারের সাতটি উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বৈষম্যহীন জনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র, এবং জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বিশেষভাবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আলোকে একটি সামাজিক সুবিচার ও মানবিক মর্যাদা সংবলিত রাষ্ট্র গঠন করা তাদের লক্ষ্য।
জনগণের মতামত সংগ্রহ: সংবিধান সংস্কার বিষয়ে জনমত সংগ্রহের জন্য কমিশন একটি ওয়েবসাইট চালু করেছে, যেখানে আগামী ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত জনগণ তাদের মতামত জানাতে পারবেন।
উপসংহার : সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই সংস্কার সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছে, তা জাতির রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের প্রতি আগ্রহকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ, এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন, যাতে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আসে এবং জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার সঠিক প্রতিফলন ঘটে।
তবে, জনগণের মতামত সংগ্রহের জন্য ওয়েবসাইট চালু করায় সংবিধান সংস্কার কমিশন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা জনমতের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি পরামর্শ, মতামত ও প্রস্তাবনা গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম হিসাবে কাজ করছে।
এই প্রক্রিয়া ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে যদি সংবিধান সংস্কার সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করবে।
আপনার মতামত লিখুন :